সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিন- আবুল কালাম আজাদ

সম্পাদকীয়

আবুল কালাম আজাদ

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও দেশে সাংবাদিকরা নানা স্বার্থবাদী মহলের নিশানায়। কেন? কারণ একটাই—সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে তাঁদের সাহসী অবস্থান। এ কথা ঠিক, একটি স্বাধীন দেশে এখন আর সরাসরি রাজনীতির জন্য সাংবাদিকতা করার প্রয়োজন নেই। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে এগিয়ে যাওয়ার যে রাজনীতি, আজকের সাংবাদিকরা তো সেই রাজনীতিরই সহযাত্রী। সাধারণভাবে সাংবাদিকদের এই পথচলা নিরাপদ হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাংবাদিকরা খুন হচ্ছেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কেন? তাঁদের পেশাদারির কারণে।

গতকাল ৩১শে মার্চ ২০২০ইং ভোলার বোরহানউদ্দিনে, সাংবাদিক সাগর চৌধুরির উপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েছে সন্ত্রাসী নাবিল। সাংবাদিকের উপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ভিডিও ধারণ করে তা আবার ফেইজবুকে লাইভ ও করেছেন পেশাদার এ সন্ত্রাসী। নাবিল ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও মানিকা ইউপি চেয়ারম্যান, জসিম হায়দারের ছেলে। হামলার কারন হিসেবে জানা যায়, নাবিলের বাবা (চেয়ারম্যান) এর সরকারি বরাদ্ধকৃত চাল আত্মসাতের নিউজ করেছিলেন সাংবাদিক সাগর।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নির্যাতিত হওয়া দেশে যেন নিত্যকার ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। সাংবাদিক নির্যাতনের এসব ঘটনা যে কেবল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগাতেই ঘটছে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনও এমন নির্যাতনের ঘটনার অংশীদার হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের ওপর এমন প্রকাশ্য ও চোরাগোপ্তা হামলার বহু ঘটনাই ঘটেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে এমন নানা হামলায় বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক আহত হয়েছেন এবং অনেকে নিহতও হয়েছেন। এই পরিস্থিতি সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের জন্য অশনি সংকেত।

স্বস্থির কথা হলো, গতকাল রাতে সারাদেশের সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে
বোরহানউদ্দিন থানা কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক সাগর নির্যাতনের মামলাটি গ্রহণ করেছে। বাকিটা আসামি গ্রেপ্তারের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হবে।

এটা উদ্বেগজনক যে সাংবাদিকদের ওপর হামলা-নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। সাংবাদিক নির্যাতন ও সাংবাদিক হত্যার যথাযথ বিচার না হওয়া স্পষ্টতই অপরাধীদের দায়মুক্তি দিচ্ছে। একে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতারা। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে অন্তত ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। একদিকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নানারকম ভয়ভীতি-হুমকির কারণে সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হয়ে উঠছে; আরেক দিকে, শারীরিকভাবে হামলা ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। এসব হামলা-নির্যাতন সাংবাদিকতা পেশাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং তথ্যপ্রকাশে বাধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও খর্ব করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করে আসছেন যে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা অনেকটাই নীরব। কিন্তু গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.