দেশের এই ক্রান্তিকালে দেশ ও জাতির প্রতি বিশিষ্ট লেখক হ ম আজাদের কিছু অভিব্যক্তি ও অপ্রিয় সত্য কথা।

কোরোনা ভাইরাস সম্পাদকীয়

চট্টগ্রাম:

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরা নোভেল করোনাভাইরাসের কারনে আমাদের এই সবুজ শ্যামল সুন্দর ধরনী এখন মহা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশে দেশে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে। এখন পর্যন্ত এর কোন প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। এমতাবস্থায় মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা ছাড়া মানবজাতির মুক্তির আর কোন পথ খোলা নেই। তবে বিশেষজ্ঞের মতে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতার সহিত সচেতনা অবলম্বন করলে এই মহামারী ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
আলহামদুলিল্লাহ এখনো পর্যন্ত মহান স্রষ্টা আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ এবং দেশের নাগরিকগণ অন্যান্য দেশের তুলনায় খুব ভালো রেখেছেন। কিন্তু কিছু নাগরিকদের অসচেতনা ও হেয়ালিপনার কারনে মহা দুর্যোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।
সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশ সরকার করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এর ধারাবাহিতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব সেবাদানকারী সংস্থা গুলো সরকারী বিধিবিধান মোতাবেক দেশের জনগণকে সতর্ক ও সচেতন থাকার লক্ষে দিনরাত প্রচার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।
একটি কথা ধ্রুব সত্য যে, মানুষিক ভারসাম্য ব্যক্তি ছাড়া আমরা সবাই করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে মানুষিকভাবে কমবেশি বিপর্যস্ত হয়ে পরেছি। এমতাবস্থায় মানবজাতিকে একিনের সহিত বেশি বেশি মহান স্রষ্টার আরাধনা করতে হবে। একমাত্র তিনি-ই আমাদের এই মহা বিপদকালের ভরসা এবং মুক্তিদাতা। এর পাশাপাশি নিজেদেরকে সুরক্ষা রাখতে বা নিজেদেরর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।
বর্তমান এই মহা দুর্যোগকালে করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকাটাই হচ্ছে উত্তম পণ্হা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমরা তা মেনে না চলে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি, তুচ্ছ কারনে গণজমায়েতের সৃষ্টি করছি, যা সম্পূর্ণ গর্হিত কাজ। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা না হয় অবুজ, তাদেরকে নিরাপত্তার বিষয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরের মধ্যে রাখতে পরিবারের কর্তা ব্যক্তিরাই যথেষ্ট। আর যারা পূর্ণ বয়স্ক তাদেরকে বারবার সতর্ক করার পরেও যখন তারা অসতর্ক হয়ে থাকেন তখন তাদেরকে কীভাবে সঠিক পথে আনবেন ?
মানলাম করোনাভাইরাস নতুন এবং এর ভয়াবহ প্রাণ ঘাতির বিষয়ে আমরা তেমন ওয়াকিবহাল নয়। তাই বলে কারো সাবধাণ বানী শোনার পরেও তা মেনে চলাটা কী আমাদের সাধ্যের বাহিরে হয়ে পরেছে ? আজিব জাতি আমরা ! সবসময় টিভির পর্দায় চোখ রেখে চলি, বিনোদনে মত্ত থাকি, সংবাদ শুনি, সব খবরাখবর রাখি কিন্তু কখনো কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চাইনা। যার দরুন নিজে বিপদগ্রস্ত হবো অন্যকেও বিপদে ফেলবো। ঠিক যেমন অবহেলা করেছিলেন ইতালির নাগরিকরা। আজ তারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারচ্ছেন করোনাভাইরাস ভয়াবহতাকে। অবহেলা আর অসচেতনতার কারনে তাদেরকে যে এতো মানুষের জীবন বলি দিতে হবে তা হয়তো তারা ঘুণাক্ষরের কল্পনা করতে পারেননি। আজ বিশ্ববাসী কোন প্রকার যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়াই নিজ নিজ ঘরে বন্দি হয়ে পরেছেন। তারা ব্যস্ত নিজেকে রক্ষার্থে, আর আমরা বাঙালিজাতি ব্যস্ত বিনোদন নিতে ও দিতে। আফসোস হয় মনে।
বাংলাদেশ সরকার করোনাভাইরাসের বিস্তার বোধে এবং সর্বসাধারণের নিরাপত্তার জন্য গত ২৪/০৩/২০২০ তারিখ থেকে আগামী ০৪/০৪/২০২০ তারিখ পর্যন্ত সকল সরকারী বেসরকারি অফিস এবং ০৯/০৪/২০২০ পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছেন, শুধু সেবাদানকারী সংস্থা গুলো এর আওতামুক্ত রেখেছেন। মানে তাদের ছুটি বন্ধ করা হয়েছে। কারন দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে জরুরী সেবাদানে এদের প্রয়োজন পরে সর্বাগ্রে। আর তারাও জরুরী প্রয়োজনে সব বিপদআপদকে তুচ্ছ ভেবে আমাদের সেবা দিতে সচেষ্ট থাকেন। অতীতেও এর অনেক নজীর রয়েছে। তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও সেবাদানে কার্পণ্য করেন না।মানুষ ভুলের উর্ধে নয়, তাই কাজ করার সময় দুইএকটা ভুল হওয়াটাও স্বাভাবিক। ষোল কোটি জনসংখ্যার দেশে মাত্র কয়েক লক্ষ সেবাদানকারী মানুষ গুলো প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘন্টা ডিউটি পালন করতে গিয়ে দুইএকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনার সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। তাছাড়া জেনেশুনে কেহ ভুল করতে চান না, হয়তো অবচেতন মনে ঘটনাটা ঘটে যায়, নয়তো পরিস্থিতি তা করতে বাধ্য করে। ওসব দেখে আমরা আমাদের বহু দিনের ঘুমন্ত চেতনাকে জাগ্রত করে সোসাল মিডিয়া সহ পাড়া, মহল্লায় চায়ের আড্ডায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখরিত হয়ে আকাশ বাতাস কম্পিত করে তুলি। আমরা গুজবে বিশ্বাসী হুজুগে বাঙালি বলে কথা, শুধু অন্যের সমালোচনা করতে শিখেছি, নিজে দেশ ও জাতির জন্য কতটুকু নাগরিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি তা ভাবছি না। আমাদের কানের কাছে ঢোল পিটিয়ে বললেও, ভালো কাজের কথা আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনা। মনে রাখতে হবে এই মহা দুর্যোগের সময় আমাদের নিরাপত্তা আমাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমাদেরকেই ভোগ করতে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সময় থাকতে সতর্কতার সহিত সচেতন হয়ে নিজের সুরক্ষা বলয় সৃষ্টি করতে আপনা থেকেই উদ্যোগী হই।
করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে গিয়ে বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট্র গুলোর ভীত নড়ে যাচ্ছে, নাগরিকগণ মানুষিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে, সরকার গুলো সর্বসাধারণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অস্থির হয়ে আছেন, সব প্রযুক্তি আজ ব্যর্থ হয়ে পরেছে, সবাই একপ্রকার ইয়ানাফসি ইয়ানাফসি করতে শুরু করেছেন, এ যেনো কেয়ামতের আলামত দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায় আমার দেশের সরকারের নির্দেশক্রমে গত ২৪/০৩/২০২০ তারিখ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যারাক ছেড়ে রাজপথে এসে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই মহা দুর্যোগ মোকাবিলা করতে এবং জনগনকে নিরাপ রাখার জন্য ২৪ ঘন্টা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, মাইকিং করছেন, প্রচারপত্র বিলি করছেন ও সর্বসাধারণকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে যাচ্ছেন, আমদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য অনুরোধ করছেন। তার পরেও আমরা তা না মেনে নিজেদের ইচ্ছামত চলাফেরা করছি, আড্ডা দিচ্ছি, মৌজ মাস্তিতে মেতে রয়েছি, কিন্তু জনসচেতনতা মেনে চলার তেমন আগ্রহপ্রকাশ করছিনা। এমতাবস্থায় এই পোশাকদারী রক্তে মাংসে গড়া ঠিক মানুষের মত দেখতে রোবট গুলো আইন অমান্যকারীদের উপর যখন কঠোর হয়ে কিছু উত্তমমধ্যম দিয়ে থাকেন, তখন আমরা আমাদের চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সোশাল মিডিয়া সহ পাড়া মহল্লায় থেকে প্রতিবাদে মুখরিত হয়ে বলতে থাকি, আহারে, শেষ গেলোরে, না খেয়ে মরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেরে, গরিবদুঃখীর পক্ষে কেহ নাইরে, প্রভৃতি নীতিবাক্য উচ্চারণ করে যাই। তবে এটা অস্বীকার করছিনা যে প্রশাসনের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তা, কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করার সময় কিছুটা অতিরঞ্জিত করছেন। এর জন্য তারা শাস্তি ভোগও করছে অতিদ্রুত। তাই বলে আমরা এই দুইএকটা অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে সারাক্ষণ সোরগোল পাকাতে থাকি তাহলে যে বৃহৎ সংখ্যক জনবল আমাদের সহযোগিতায় কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরকে উৎসাহ দেয়ার সময় পাচ্ছি কোথায় ? এই মুহুর্তে তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে আমরা যদি উৎসাহ করে না যাই একসময় দেখা যাবে তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে গেছে। তারের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়া মানে আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও কমে আসবে, এটাই স্বাভাবিক।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার আপত কালীন বাজেট ঘোষণা, দুস্থজনের জন্য খাদ্য বরাদ্দ করেছেন যা অনেক জেলাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেও গেছে। ভূমিহীনদের জন্য আবাসন দেয়ার কথা বলেছেন যা আমরা কমবেশি সবাই অবগত হয়েছি। তারপরেও কেনো যে আমরা আদিখ্যেতা দেখাতে গিয়ে মায়াকান্না জুড়ে দেই তা বোধগম্য নয়। আচ্ছা এই উর্দি পড়া মানুষ গুলোর সাথে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কারো কোনো শত্রুতা আছে ? আমারতো মনে হয় অপরাধী ছাড়া বাকি সবার উত্তর হবে না। তাহলে তারা তাদের দায়িত্ব পালনকালে একটু কঠোর হলে আমরা কেনো তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকি। বর্তমান এই মহা ক্রান্তিকালে আমাদের ভালোর জন্যই তারা এই কাজটি করছেন। এরা তো আমাদেরই ভাই, বোন, বাবা, মা, আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশি হয়। তাদেরকে নিয়ে আমরা কেনো এতো বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাদের দায়িত্ব পালন থেকে নিরুৎসাহিত করছি ? আমরা কী একবারও ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মনের অবস্থা কেমন আছে ? এই সেবা সংস্থার নারী পুরুষ গুলো নিজেদের জীবন বিপন্ন হবে জেনেও নির্ভয়ে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছে হাসিখুশি থেকে।

আপনার আমার মতো তাদের বাড়িতেও তো পরিবার পরিজন রয়েছে। হয়তো অনেকেই বলবেন যে, তারাতো জেনেশুনে এই কাজে এসেছে। হ্যাঁ আপনাদের কথা সঠিক, তাই আমি তাদেরকে রক্তে মাংসে গড়া রোবট বলে উপরে উল্লেখ করেছি। তা না হলে কোন মানুষ এই মহা সংকটময়ে আমাদের সবাইকে নিরাপদে ঘরে মধ্যে থাকতে বলে নিজেরা বিপদের মধ্যে পথেঘাটে পরে থাকতেন না। এরিমধ্যে হয়তো অনেকের মনে নতুন প্রশ্নের উদয় হয়েছে যে, এর জন্য তো তাদেরকে বেতন দেয়া হচ্ছে এবং আমাদের আয়কর প্রদানের মাধ্যমেই তা পেয়ে থাকেন ! হ্যাঁ এটাও বেশ যুক্তিযুক্ত কথা, আমরা দেশের মালিক তারা হলেন আমাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী। তবে এটাও আমাদের জানা প্রয়োজন যে তারাও কিন্তু আমাদের মতো আয়কর প্রদান করে থাকেন। এছাড়া আমাদের আয়কর জমা নিতে গিয়ে আয়কর বিভাগের জাঁকজমক ভাবে আয়কর মেলা বসাতে হয়, আর তাদের আয়কর প্রতি মাসের মাসিক বেতন থেকে সরাসরি কেটে নেয়া হয়। আমরা আয়কর দিতে ফাঁকিবাজি করলের তারা কিন্তু তা করছেননা। আমরা কী ভেবে দেখেছি যে, এরা এতো কষ্টস্বীকার করেও কেনো নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন ? এরা শ্রদ্ধাশীল, তাই তারা আমাদের বিরক্তিকর বাঁকা চোখের চাহনি দেখে, মুখের কর্কশ ভাষা শ্রবণ করেও আমাদেরকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পানল করে যাচ্ছেন আনন্দচিত্বে। পুরো দেশের মানুষ যখন হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে নিজ ঘরে অবস্থান করছে, তখন এরা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাড়া মহল্লা ও গ্রাম গঞ্জের অলিগলি ঘুরে ঘুরে আমাদেরকে নিরাপদ রাখতে আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন, আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতার সহিত সাবধানতা অবলম্বন করার কথা বলে যাচ্ছেন।
আমরা সবসময় নিজেদেরকে সুনাগরিক হিসেবে দাবি করে আসছি। কিন্তু সঠিকভাবে নাগরিক দায়িত্ব পালন করছিনা এবং করার চেষ্টাও করছিনা। আচ্ছা দেশ ও জাতির সব দায়িত্ব কী এই উর্দি পাড়া মানুষ গুলোর উপর ন্যস্ত ? দেশের নাগরিক হিসেবে আমার আপনার কোন দায়িত্ব নেই ? হয়তো অনেকেই বলবেন আছে তো ! যদি থেকেই থাকে তাহলে আমরা তা কতটুকু পালন করছি ? আপনি আমি যখন পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কিনেছি তখন প্রতিবেশি দুস্থ পরিবারটির জন্যও কী তা কিনেছি ? আমরা যখন নিজেদের খাবারের জন্য বাজার থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনে মজুত করে রেখেছি তখন প্রতিবেশি অভুক্ত দুস্থ পরিবারকে কী কিছু খাবার কিনে দিয়েছি ? এবার হয়তো অনেকেই আমার উপরে চটে গিয়েছেন, আবার অনেকে মনে মনে বলেও ফেলেছেন রাখেনতো মিয়া নীতি কথা নিজে বাঁচলে বাপের নাম। অনেকে আবার বলবেন যে, দিয়েছিতো ভাই সাধ্যমতো। আমরা যে কে কাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি তা ভালোই জানা আছে। আমরা একটাকার পণ্য দান করে একশ টাকার ভাব নিয়ে প্রচার প্রচারণা করার জন্য ব্যস্ত থাকা এক জাতি। তবে সবার জন্য এই কথাটা বলা নয়। কিছু সামাজিক সেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে যারা যেকোনো দুর্যোগকালে প্রথমে নিজেদের পকেট মানি থেকে দুস্থদের সহযোগিতা করে থাকেন, তারপরে বিত্তবানদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে বিনীত আহ্বান করেন এতে কেহ সারা দেন আমার কেহ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলেন এসব করে আমার কী লাভ ? লাভ তো ঐ সংগঠনেরই হবে, তারাই সুনাম কুড়াবে। এই হলো আমাদের নাগরিক দায়িত্ব পালনের নমুনা। আমরা লাভের পাগল। এই হলো আমাদের মনমানুসিকতা।
যাই হোক পূর্বের আলোচনায় ফিরে আসি। আমরা সেবাদানকারী মানুষ গুলোর রূঢ় ব্যবহার নিয়ে মেতে থাকি, কিন্তু তাদের অমায়িক ব্যবহার কখনো চোখে দেখিনা, দেখার চেষ্টাও করিনা। তারা যে আমাদের মতো মানুষ সেটাও মেনে নিতে পারছিনা। তাদের হৃদয় মাঝে যে বেদনা লুকিয়ে আছে তা আমরা উপলব্ধি করতে শিখিনি, তারা তাদের পরিবার পরিজন বাড়িতে রেখে আমাদেরকে সেবা দিতে ২৪ ঘন্টা কর্মস্থলে থাকছেন সরকারী নির্দেশ পালন করার জন্য। তাদের হাসিখুসি মুখাবয়ব দেখে আমরা ভাবি তারা তো বেশ সুখেই আছে, কিন্তু না আমাদের ভাবনাটা ভুল। তাদের একাকীত্ব সময় তাদের ব্যথাতুর হৃদয়ের প্রকাশিত আকুতির নীরব সাক্ষী, তাদের মাথার নিচে থাকা তুলতুলে তুলার বালিশটা বলতে পারে তাদের চোখের নোনাজল প্রতি রাতে কতটুকু চুষে নিতেছে।

যেকোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা বেওয়ারিশ লাশ দেখে আমরা যখন নাকেমুখে কাপড় গুঁজে দূর থেকে উকি দিয়ে একনজর দেখে ঘুরপথে হেঁটে চলে যাই আর পঁচা গলা লাশ হলে তো আর কোন কথাই নেই দুর্গন্ধ এড়াতে দ্রুত পলায়ন করি। কিন্তু এই বোরট গুলো তখন পরম মমতায় সেই লাশ গুলো তুলে নিয়ে নিয়মানুযায়ী আইনি কার্য শেষে লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করেন বা দাফনকাজ সম্পন্ন করেন। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে কারো মৃত্যু হলে আমরা যে কী করবো তা বিভিন্ন দেশের ভিডিও ফুটেজ গুলো দেখেই সবাই বুঝতে পারছি। ওয়ারিশ থাকা সত্ত্বেও মানুষ গুলো মরে বেওয়ারিশ হয়ে পরে থাকছে, এই উর্দি পড়া রোবট গুলোই পরম শ্রদ্ধার সাথে সেই লাশ গুলোকে সর্বসাধারণের আশপাশ থেকে নিরাপ দূরত্বে চিরদিনের জন্য শায়িত করে আসছে। আর মনেমনে ঢুকরে কেঁদে উঠে বলছে তোমরা মরে গিয়ে বেশ ভালো করেছো, আমরা বেঁচে থেকেও জিন্দা লাশ হয়ে আছি এই নশ্বর পৃথিবীতে, আপন জনের মুখটি পর্যন্ত দেখতে পারছিনা, এমনি ভাগ্য আমাদের, ভালো থেকো তোমরা ওপারে গিয়ে।
একটা কথা না বললেই নয়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ব্যবস্থা করণের জন্য এই সেবাদানকারী মানুষ গুলো তাদের নিজ জীবনে মায়া ও পরিবার পরিজনের সঙ্গ ত্যাগ করে দিনরাত আমাদের জনসচেতনতা মূলক দিক নির্দেশনা এবং নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে নিঃস্বার্থভাবে। এই দুঃসময়ের সঠিক পথের দিশারিরা কাছে এসে বা দূরে থেকে তাদেরকে সাহস যোগাবে, আর মুখোশধারিরা দূরে থেকে শুধু নেতিবাচক সমালোচনা করে যাবে। যারা লোক ঠকাতে সিদ্ধিহস্ত, অনৈতিক ও সংবিধান পরিপন্থী কাজ করতে কিছু মনে করে না তাদের কাছে সঠিক পথে থেকে ভালো কাজ করার মানুষ গুলো সবসময় বোকা হয়ে থাকে। আমরা অন্যের দোষ খুঁজে দেখার পাশাপাশি যদি নিজের করনীয় বিষয় নিয়ে ভাবতে পারতাম তাহলে দেশ সমাজ এবং আমাদের জীবনটা অনেক সুন্দর ও সুখের হতো। অপ্রিয় সত্য কথা হলো আমরা অন্যের ভালো কাজের মূল্যায়ন করতে জানি না।
পরিশেষে বিনীত অনুরোধ করে বলবো, এই মহা দুর্যোগের পর কার সাথে কার দেখা হবে তা অনিশ্চিত, তাই আসুন আমরা পরস্পর পরস্পরকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখি, আমিও একজন ক্ষমাপ্রার্থী।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে ক্ষমা করে দিন। আমীন।।
লেখক: হ ম আজাদ, কবি ও কথাসাহিত্যিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.