করোনা ভাইরাস এবং মহামারীর বিরুদ্ধে ইসতিয়াকের যুদ্ধ জয়ের গল্প

কোরোনা ভাইরাস

সুমন মোহাম্মদঃ

বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস কোভিড-১৯। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দেশে দেশে চলছে লকডাউন।ফলে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না শ্রমজীবী মানুষজন।কাজ-কর্ম বন্ধ থাকায় অসহায়ত্ব জীবন-যাপন করছে এসব শ্রমজীবি মানুষেরা।একদিকে লকডাউন অন্যদিকে জীবন এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সবচেয়ে বিপাকে রয়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজন। তাঁরা না পারেন কাজে যেতে না পারেন কারো কাছে হাত পাততে।যেন তাঁরা উভয় সংকটে।
মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খাদ্য। খাবার না খেয়ে কোন জীবকুলের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব না।সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে চাই সুষম ও পর্যাপ্ত খাবার।একমুঠো খাবারের জন্য প্রয়োজনে মানুষও কখনো কখনো অমানুষ হয়ে উঠে।
এসব অসহায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অনেক তরুন।

তাদেরই মধ্যে একজন তরুণ ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়।
ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপ-অর্থ বিষয়ক সম্পাদক তিনি
ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ(DURS) এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন
করোনা ভাইরাসের শুরুর দিকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হলো,তখন সবাই ঢাবি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলেও ইসতিয়াক আহমেদ ক্যাম্পাসেই থেকে যান ক্যাম্পাসের ৪০০ কুকুর বিড়ালকে খাবার খাওয়ানোর জন্য।
তিনি সহ বেশকয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের টাকা দিয়ে পালাক্রমে এই প্রাণীদের খাবার খাওয়ানো দিয়েই শুরু করেন এই করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধ ময়দানে লড়াইটা ভালোই চলছিলো প্রতিকুলতার ভীরে।

মহামারীর শুরুটা ৬ এপ্রিল গ্রাস করে ইসতিয়াক আহমেদকে। সেদিন থেকে অসুস্থতা অনুভব করেন,তারপর ৮ এপ্রিল টেস্ট এবং ফলাফল পজেটিভ আসে।আলাদা হয়ে যান সবার থেকে।ঔষধহীন অদৃশ্য এই ভাইরাসের ছোবলে সবাই যখন মনোবল হারিয়ে হেরে যাচ্ছে সেখানে ইসতিয়াক আহমেদ ঘুরে দাড়িয়েছে প্রতিকূলতা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে।১৫ তারিখের টেস্টে করোনা নেগেটিভ আসে।

যার রক্তে মানুষের পাশে দাড়ানোর নেশা তাকে থামিয়ে রাখাটা খুব কঠিন কাজ।
ফিরে গেলে ক্যাম্পাসের অভুক্ত প্রাণীদের কাছে।
আবারো তাদের খাবার খাওয়ানো শুরু করলেন।
৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অনেক অসহায় শিক্ষার্থীর পাশে দাড়ানো শুরু করলেন ইসতিয়াক আহমেদ।

শুরুটা ছিলো ভিন্নরকম।নিজের টিউশনির জমানো ১৫০০০ টাকা উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন শিক্ষার্থীদের কাছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বান্চারামপুরের ছেলে ইসতিয়াক।করোনা ভাইরাসের শুরু থেকেই নিজ জেলা উপজেলায় সচেতনা বৃদ্ধির জন্য লিফলেট মাইকিং নিজে করেন।সেই সাথে শুরু হয় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম।

নিজেই করোনা ভাইরাসকে পরাজীত করার পর থেকে নিজের ত্রাণ বিতরন এবং উপহার দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া শুরু করলেন।
নিজের টিউশনি সহ নিজের জমানো প্রায় ৫০ হাজার টাকা উপহার হিসেবে শিক্ষার্থী এবং অসহায় মানুষদের কাছে পৌঁছে দেন।এছাড়াও ইসতিয়াকের পরিচিত বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে আরো ২৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।

সারা দেশব্যাপী ১৪০+ পরিবারের কাছে পৌঁছে গেছে ইসতিয়াক আহমেদের এই উপহার।পুরোপুরি ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করার পাশাপাশি পারিবারিকভাবেও এলাকার মানুষের কাছে উপহার পৌঁছে দিয়েছেন ইসতিয়াক আহমেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় এই ছাত্রনেতা যেমন ক্যাম্পাসে জনপ্রিয়,ঠিক সামাজিক দায়বদ্ধতার উর্ধে যেয়ে নিজ এলাকা থেকে শুরু করে দেশব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী সহ অনেক অপরিচিত অসহায় মানুষের কাছে এক শুভেচ্ছা এবং আশীর্বাদের নাম ইশতিয়াক আহমেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ৪০০ অবলা কুকুর বিড়াল ইসতিয়াক আহমেদের উপস্থিতিতে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠে।

জানা যায়, পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সংগঠন করে থাকেন। করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার দিনগুলোতে সবাই যখন ঘরে অবস্থান করছেন সে সময়টাতে ইসতিয়াক প্রতিনিয়ত মানবিক, সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে রাত দিন পরিশ্রম করে কখনো স্যানিটাইজার বানাচ্ছেন, কখনো ত্রাণ বিতরণ করছেন, কখনোবা মাস্ক বিতরণ সহ সচেতনামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের বাস রুট শ্রাবণ স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন এর সাবেক সভাপতি ইসতিয়াক অন্যান্যদেরকে সাথে নিয়ে প্রায় ২৫০ টি পরিবারের ত্রাণ বিতরণ করেছেন বাসাবো, মুগদা, মানিকনগর, বৌদ্ধ মন্দির এলাকায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মহিবুল্লাহ আলভী ইসতিয়াক আহমেদকে নিয়ে বলেন,আমরা সবাই যখন ঘরে বন্দী,তখন ক্যাম্পাসের নিরীহ প্রাণীগুলোর জন্য নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে ইসতিয়াক আহমেদরা যুদ্ধ করছে,দেশের বিভিন্ব প্রান্তে অসহায় মানুষদের কাছে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া,এবং একসময় নিজেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এবং আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে আবারো যে লড়াই শুরু করেছেন এথেকেই উনি আমাদের দেশের জন্য আমাদের জন্য একজন বিজয়ী যোদ্ধা, এবং লড়াকু যোদ্ধাদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন।

ইসতিয়াক আহমেদের সাথে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, পুরো বিশ্বব্যাপী এই মহামারীর ছোবলে আমরা যখন অসহায়,তখন আমরা তরুণ সমাজ এগিয়ে না আসলে আপামর জনতার মাঝে হাহাকার সৃষ্টিহবে।ইসতিয়াক জানান, ‘আজ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় ১৪০+টি পরিবারকে বাজার এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে থেকেছি। মানবতার কাছে আমরা হেরে গেলে করোনা যুদ্ধে হেরে যাব। হারতে চাইনা। আমার এ চেষ্টা অব্যাহত রাখব। মানবিক কাজগুলো করার মাধ্যমে জাতির পিতার আদর্শকে মনে ধারণ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখব।’
ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি আমার সাধ্যমত এগিয়ে এসেছি। এর মাধ্যমে এদেশের বিত্তবান, শিল্পপতিদের প্রতি আহবান আপনারা নিজ নিজ এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। অসহায়দের খাদ্যসংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসুন, এক বেলা আহার নিয়ে তাদের হাহাকার, কান্না থামাতে এগিয়ে আসুন। সর্বোপরি প্রিয় মাতৃভূমি থেকে করোনার ভয়াবহতা দূর করতে প্রত্যেকে এগিয়ে আসুন। যারা ত্রাণ বিতরণ করবেন আপনারা অবশ্যই অবশ্যই নিরাপদ দূরত্বের ব্যাপারটি মাথায় রাখবেন। ত্রাণ নিতে এসে যেন কেউ পেন্ডামিক করোনায় আক্রান্ত না হোন”।

চলমান এই যুদ্ধেসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামরীতে ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়রাই যুদ্ধে লড়াই করে মানুষের পাশে দাড়িয়েছে গৌরব এবং বীরের বেশে।

Tagged
সুমন মোহাম্মদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিনিধি -মুক্ত বাংলা টিভি অফিস-কনফিডেন্স সেন্টার, ১২ তলা,শাহাদাতপুর ঢাকা ১২১২

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.