অনলাইন শিক্ষা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাস্তবতা:-ড. গৌতম সাহা

ক্যাম্পাস ঢাকা শিক্ষা

বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন অনলাইন ক্লাস হচ্ছে না এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামত আছে। যদি অনলাইন ক্লাস নেয়ার কথা বলা হয় তাহলে সাধারণত তিনটি বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে, তা হলো ১. ছাত্র-ছাত্রী, ২. শিক্ষক, ৩. অনলাইন শিক্ষা এবং পরিবেশ। আমার লেখায় আমি এই তিনটি বিষয় আজ তুলে ধরবো।

১. ছাত্র-ছাত্রী: অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করার জন্য আমাদের প্রথমেই জানতে হবে ছাত্র-ছাত্রীরা কি ভাবছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের মতামত জানার জন্য একটি জরিপ পরিচালনা করে। আমাদের গণিত বিভাগে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৬০০ এর চাইতেও বেশি। কিন্তু এই জরিপে অংশগ্রহণ করেছে মাত্র ২২৬ জন ছাত্র-ছাত্রী। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ছাত্র-ছাত্রীদের মতামত আমরা জানতে পারিনি। তার মানে হলো, বড় একটা অংশ আমাদের নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের অনেকের অবস্থান প্রান্তিক গ্রাম গুলোতে, অনেকের অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে, অনেকের প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা নেই।

ফিরে আসি আমাদের জরিপে অংশ নেয়া ২২৬ জন ছাত্র ছাত্রীদের মতামত নিয়ে। তাদের অধিকাংশ অবস্থান করছে জেলা শহরগুলোতে। তাদের সবাই অনলাইনে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫% অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী এবং ১৬.৩% সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এই ২২৬ জন ছাত্র-ছাত্রীকে আরো একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তা হলো, তাদের সবার কি অনলাইন ক্লাস করার মতো প্রযুক্তিগত সুবিধা আছে কিনা। আমরা এখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা বলতে বুঝিয়েছি কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগ। ৪৪.২% ছাত্র-ছাত্রী জানিয়েছে তাদের অনলাইনে ক্লাস করার মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা আছে যাদের মধ্যে মাত্র ৩৫% অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী ছিল। বাকি যে ১৬.৭% সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল তাদের মধ্যে প্রায় ৯% ছাত্র-ছাত্রীর কিন্তু অনলাইন ক্লাস করার মতো সামর্থ ছিল। বাকি ৪৮.৭% বলেছে তাদের কোনো প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা নেই এবং তারা অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী নয়। আর ৭.১% এই বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। এই যে জরিপটি পরিচালনা করা হলো সেটা শুধু একটি বিভাগের চিত্র। আমি অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে তুলনামূলক একই চিত্র খুঁজে পেয়েছি।

এই জরিপ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, আমাদের ছাত্র ছাত্রীরা এখনো অনলাইন ক্লাস করার মতো প্রস্তুত নয়, অথবা তাদের যে সুযোগ সুবিধা গুলো দেয়া দরকার সেটা দেয়ার সামর্থ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো অর্জন করতে পারেনি।

২. শিক্ষক: অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করার জন্য সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিক্ষকরা। কারণ তাদেরকেই ক্লাস কিভাবে নিতে হবে, কিভাবে ক্লাস নিলে ছাত্র-ছাত্রীরা উপকৃত হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি তারাই পরিচালনা করবেন। এই মুহূর্তে কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনলাইন ক্লাস নেবার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন? এই জন্য আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ছোট একটি জরিপ চালিয়েছিলাম। সর্বমোট ১৬০ জন শিক্ষক তাদের মতামত প্রকাশ করেছিল। দেখা যায়, ৬৩.১% শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নেবার ব্যাপারে আগ্রহী, এবং ৩৬.৯% শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নেবার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। এতে একটা বিষয় পরিষ্কার, আমাদের শিক্ষকরা সব প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়েই অনলাইন ক্লাস নিতে চাচ্ছেন। তাদেরকে আরেকটি প্রশ্ন করা হয়েছিল সেটা হলো তাদের প্রযুক্তিগত সুবিধা যেমন কম্পিউটার এবং উচ্চ গতির ইন্টারনেট সংযোগ আছে কিনা। দেখা যাচ্ছে, ৭.৫% শিক্ষকের অনলাইন ক্লাস নেবার জন্য কোনো কম্পিউটার নেই, ১৫% শিক্ষকের উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ নেই, ৩৬.৩% শিক্ষকের কোনো কম্পিউটার এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ নেই। শুধুমাত্র, ৪১.৩% শিক্ষকের কম্পিউটার এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ আছে। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে, ২১.৮ % শিক্ষকের প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকার পরও তারা অনলাইন এ ক্লাস নিতে আগ্রহী।

৩. অনলাইন শিক্ষা এবং পরিবেশ: অনলাইন এ ক্লাস পরিচালনা করার জন্য দরকার হয় একটি অনলাইন ক্লাসরুম। এই সুবিধা আমাদের দেশের কোনো পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। তাই অনলাইন ক্লাস নেবার জন্য আমাদের সহায়ক মাধ্যম হচ্ছে জুম্, গুগল ক্লাসরুম, ইউটিউব ইত্যাদি। কিন্তু আপনি এগুলো ব্যবহার করে কিছু ছাত্রকে সেই ক্লাসরুম এ যুক্ত করে কোনো একটি বিষয় পরিয়ে ফেলতে পারবেন ব্যাপারটি কিন্তু শুনতে যত সহজ মনে হচ্ছে তেমন নয়। বরং যারা এই মাধ্যম গুলো ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছেন, তাদের কেউই আমাকে পজিটিভ ফিডব্যাক দেয়নি। আপনি গণিত ক্লাস এ যেয়ে গল্প বলবেন না, গণিত পড়াবেন। বাংলা ক্লাস এ গিয়ে সাহিত্য পড়াবেন। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। আপনি ফাঙ্কশনাল এনালাইসিস, রিয়েল এনালাইসিস, টোপোলজি, টেনসর, মেকানিক্স, ম্যাথেমেটিক্যাল মেথডস ইত্যাদি বিষয়ের ক্লাস ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস রুম এ পড়ানোর পরও অসংখ্য প্রশ্ন থেকে যায়, তাদেরকে আপনি অনলাইন এ পড়াতে যান, কিভাবে পড়াবেন? বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের ল্যাব থাকে, যেখানে তাদের কাজ করতে হয়, সেটাও আপনি কিভাবে করবেন?

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকেই অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগছে, আমরা প্রতিটা বিভাগ থেকে তাদেরকে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করছি, আমাদের শিক্ষক সমিতি থেকেও তাদেরকে সাহায্য করছে। আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এই সহযোগিতা করার জন্য অনেক শিক্ষক অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। মানসিক ভাবে অনেক ছাত্র-শিক্ষক ভালো নেই, এটাও কিন্তু বুঝতে হবে। আমাদের ছাত্রদের পড়াশুনা করার পরিবেশ পাচ্ছে কিনা সেটাও ভেবে দেখা দরকার। ছাত্র-ছাত্রীরা হল ছেড়ে যাবার সময় তারা অনেকেই তাদের পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বই সমূহ সাথে নিয়ে যেতে পারেনি, তারা যে ক্লাস করার জন্য পড়াশুনা করবে সেই সুবিধা কোথায়? আর, সব ছাত্র-ছাত্রীরা যে বাসায় বসে আছে বিষয়টা তেমন নয়, বরং তারা জন-সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করছে, গরিব আর দুস্থ মানুষদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবশেষে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের সঙ্গে যে ভার্চুয়াল সভা করেন সেখানেও তিনি বলেছেন, ইন্টারনেট সুবিধাসহ প্রযুক্তিগত অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনলাইন ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহনের সক্ষমতা নেই। অনেকের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে, সেটাও তিনি বলেছেন। এটা শুধু আমাদের জন্য নয়, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সত্য। এটাই আমাদের বাস্তবতা।

লেখক: ড. গৌতম সাহা
সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Tagged
সুমন মোহাম্মদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিনিধি -মুক্ত বাংলা টিভি অফিস-কনফিডেন্স সেন্টার, ১২ তলা,শাহাদাতপুর ঢাকা ১২১২

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.